Ticker

6/recent/ticker-posts

মহান মে দিবস আজ

We hold and hail the workers day
To pay tribute to workers of all times,
And proclaim and say thanks aloud!
Workers are the true backbone of the world.

 মহান মে দিবস : কি এবং কেন?

গ্রীষ্মের প্রচন্ড উষ্ণতায় মানুষ থেকে প্রানী সবাই হিমেল ছায়ার সন্ধানে ছুটে চলে। তপ্ত রোদ থেকে নিস্কৃতি পেতে পাখিরা আশ্রয় নেয় গাছের মগডালে পত্র-পল্লবের ছায়ায়।  গরমের নিকট সবাই কাবু হয়ে যখন প্রশান্তির ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে তখন শ্রমজীবি মানুষগুলোকে এতটুকু পর্যন্ত টলাতে পারেনা গ্রীষ্মের উষ্ণতা। শ্রমজীবি মানুষ গুলো গরমকে উপেক্ষা করে তাদের কর্মে থাকছে অবিচল। এই চিত্র গ্রীষ্মের হলেও শীতের চিত্রও তার বিপরীত নয়। কনকনে শীতের সকালে কম্বল-কাঁথা মুড়ি দিয়ে যখন সবাই বদ্ধ ঘরে আরামের জন্য একটু উষ্ণতা খোঁজে তখন এদেশের মেহনতি কৃষক কনকনে শীতকে চাদর বানিয়ে ছুটে যায় লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে মাঠে ফসল বুনতে। নিজের সত্তার কথা চিন্তা না করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্তকে পানিতে পরিণত করে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আজ সেই সকল মেহনতি মানুষের প্রতীক মহান মে দিবস আমাদের সামনে উপস্থিত।                               

পিছনের ইতিহাস: নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার শ্রমিকরা তখনো জানত না তারা কিভাবে নির্যাতন আর বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। তাদের ক্ষোভ শুধু ধুমায়িত হতে থাকে। নির্যাতনে যখন শ্রমিক সমাজের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তখন অধিকার আদায়ে ১৮৬০ সালে প্রথম রাস্তায় নামে শ্রমিক সমাজ। কিন্তু সংগঠিত না থাকায় শ্রমিকেরা তাদের ন্যয্য অধিকার গুলো আদায় করতে পারেনি। ১৮৮১ সালে শ্রমিকরা তাদের দাবী জোরালো ভাবে তুলে ধরে এবং সে বছরেই ন্যয্য দাবী-দাওয়া আদায়ের লক্ষে আমেরিকা ও কানাডায় গঠিত হয় দুটি শ্রমিক সংগঠন। এই দুটি সংগঠন বিভিন্ন ভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৪ সালে দু-দেশের শ্রমিক সংগঠন একটি প্রস্তাবনা পাশ করে, এতে বলা হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে শ্রমিকদের কর্মদিবস হবে ৮ ঘন্টা। ৮ ঘন্টার বেশী কোন শ্রমিক কাজ করবেনা। দুটি দেশের শ্রমিক সংগঠনের এই ঘোষনায় উদ্বেলিত হয় শ্রমিক সমাজ। তারা তাদের অবস্থানে থেকে এ ব্যপারে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে। শ্রমিকদের ৮ ঘন্টার বেশী কাজ না করতে উৎসাহ যোগায়। কিন্তু মালিক ও সরকার পক্ষ শ্রমিকদের এই প্রস্তাবনায় সাড়া না দিয়ে নির্যাতন ও নিপিড়নের পথ বেছে নেয়। এমতাবস্থায় ১৮৮৬ সালের ১ মে মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত শ্রমিকদের প থেকে কতক ন্যয্য দাবি আদায়ে শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটের সামনে বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়। শিকাগো শহরের ৭ টি সংগঠনসহ ২২ টি শ্রমিক সংগঠন এদিন মিছিলে মিছিলে ‘হে’ মার্কেটের সামনে সমবেত হতে থাকে। শ্রমিকদের এই ন্যয্য দাবীর সাথে সরকার ও মালিক পক্ষ ঐক্যমত না হওয়ায় সমাবেশ বানচাল করতে পুলিশ গুলি চালালে এতে অনেক শ্রমিক নিহত হয়। কিন্তু শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে জীবনের শেষ রক্তবিন্ধু ঢেলে দিতে প্রস্তুত তবুও তাদের ন্যয্য দাবী থেকে একচুল পরিমানও পিছপা হতে রাজী নয়। শ্রমিকদের আত্মত্যাগ আর মরিয়া ভাবের নিকট পরাজিত হয় সরকার। মেনে নেয়া হয় সকল দাবী-দাওয়া। পরবর্তীতে মার্কিন সরকার ১ মে কে ‘ল ডে’ হিসেবে ঘোষনা করে। বঞ্চনার মাঝে অধিকার আদায় করে নেয় শ্রমিকরা। তখন থেকেই মে দিবস সকলের নিকট শ্রমিক অধিকার আদায়ে আন্দোলনের প্রতিক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। শুধু আমেরিকা আর কানাডা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই সরকারি ভাবে পালিত হচ্ছে মে দিবস। বাংলাদেশেও সরকারি ভাবে পালিত হয় মে দিবস। 

আজ থেকে যদি ১৪ শত বছর পূর্বে ফিরে যাই তাহলে দেখবো মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সাঃ) তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বলেছেন “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি দিয়ে দাও”।  চির শাশ্বত সেই বানী আমাদের শ্রমিকের মর্যাদা দানে আরো উৎসাহিত করে। রাসুল (সা:) আরো বলেছিলেন, “তারা(শ্রমিক) তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধিন করে দিয়েছেন, তাই তোমরা যা খাবে তাদের তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদের তা পরতে দিবে”। তাছাড়া আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মেষ চরাতেন। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় নিজের কাঁধে পাথর বহন করে শ্রমের উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শ্রমিকদের প্রতি মর্যাদাবোধ ও অধিকার প্রদানে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আমাদের আরো কর্তব্য পরায়ন করে তুলেছেন মানবতার এই মহান বন্ধু। এমনকি অসংখ্য নবী এবং রাসুল আছেন যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। আমরা আমাদের শ্রমিকদের মর্যাদার মুল্যায়ন এখান থেকেই করতে পারি। আমরা তাদের ভাই হিসেবে তাদের সুঃখ-দুখে অংশীদার হব, বিপদে পাশে দাড়াব। আমাদের নবী রাসুলদের ইতিহাস এমন শিক্ষাই আমাদেরকে দেয়। 

দেড়শত বছর আগে থেকে মহান মে দিবস পালিত হয়ে আসলেও শ্রমিকরা তাদের ন্যয্য অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত, বরং নির্যাতন আর নিষ্পেষনের যাতাকলে পিষ্ট তারা। শ্রমিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এই প্রতীকও শ্রমিকদের ন্যয্য অধিকার আদায় করতে পারেনি। শ্রমিক সমাজ কি নির্যাতন আর নিষ্পেষনের যাতাকল থেকে কখনই মুক্তি পাবেনা? তাদের মুক্তির অধিকার কি অধরাই থেকে যাবে? হ্যাঁ শ্রমিক সমাজ মুক্তি পেতে পারে এমন একটি কল্যানধর্মী সমাজ ব্যবস্থা থেকে যে সমাজ শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মুজুরি দিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়, যে সমাজ শ্রমিকদের মানব সম্পদ হিসেবে মুল্যায়ন ও মর্যাদা প্রদান করে। সকল শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা রইল।

-ধন্যবাদ

~~লেখক~~~

যুবায়ের সিকদার

Post a Comment

0 Comments